বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৩ ১৪২৬   ১৮ মুহররম ১৪৪১

উঁচু স্বরে কথা, জিকির ও তেলাওয়াতে ইসলামের বিধান

দৈনিক চাঁদপুর

প্রকাশিত : ১২:১৬ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৯ বৃহস্পতিবার

নবী করিম (সা.) এর মজলিসে স্বীয় কণ্ঠস্বর নিচু করে কথা বলো, উচ্চস্বরে কথা বলো না। এই নির্দেশ নবী (সা.) এর ব্যাপারে অত্যন্ত জোরালো। কিন্তু কোরআন পাক অপর স্থানে সাধারণ মানুষের কথাবার্তার মধ্যেও বিকট উঁচু স্বরে কথা বলা পছন্দ করেননি।
সূরা লোকমানে ইরশাদ হচ্ছে- واقصد فى مشيك واغضض من صوتك إن أنكر الأصوات لصوت الحمير অর্থাৎ, পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিশ্চয় গাধার স্বর সবচেয়ে শ্রুতিকটু।

এ জন্য যে, গাধার ডাক অত্যন্ত বিকট ও কর্কশ হয়ে থাকে এবং অনেক দূর থেকে শোনা যায়। অতএব এটা অনুচিত যে, মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে এতো বিকট স্বরে কথা বলবে যা দ্বারা আশে-পাশে অবস্থানরত মানুষের কষ্ট হয়।

শব্দ দূষণে কাণের ক্ষতি হয়: বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো যদি কেউ প্রয়োজনাতিরিক্ত জোরে কথা বলে এবং সেই আওয়াজ অন্যের কর্ণকুহরে ধারাবাহিক যেতে থাকে, তাহলে শ্রবণকারীর কানের ক্ষতি হয় এবং ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। এ কারণে এতো জোরে কথা বলা যা দ্বারা অপরের কষ্ট হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানেও নিষেধ করা হয়েছে।

এমনকি যদি কিছু মানুষের সমাবেশে কেউ বক্তৃতা দেয় তবু ও স্বীয় আওয়াজ সমাবেশে উপস্থিত লোকদের মাঝেই সীমিত রাখতে সচেষ্ট থাকবে। সমাবেশের বাইরের লোকদের যেন কষ্ট না হয় এ ব্যপারে সচেতন থাকরে। যদি সমাবেশের আওয়াজে আশেপাশের লোকের কষ্ট হয় তাহলে তা হারাম ও কবীরা গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা অকারণে মানুষকে কষ্ট দেয়া হারাম ও কবীরা গুনাহ।

লাউড স্পিকারের অপব্যবহার: যখন থেকে লাউড স্পীকার আবিষ্কৃত হয়েছে (আল্লাহ মাফ করুন) এর অপব্যবহার এতো অধিক পরিমাণে হচ্ছে যা সরাসরি গুনাহের কারণ। লোকেরা বিবাহ-শাদী ইত্যাদি অনুষ্ঠানে জোরে মাইক বাজিয়ে গান ছেড়ে দেয়। প্রথমত: তা এতো জোরে বাজানো হয় যা পুরো এলাকাবাসীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ঘুমাতে চাইলে ঘুমাতে পারে না। কোনো অসুস্থ লোক শান্তিমতো বিশ্রাম করতে পারে না। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখা-পড়া করতে চাইলেও তীব্র আওয়াজের কারণে লেখাপড়া করতে পারে না। কেউ একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির করতে চাইলেও ভয়াবহ শব্দ দূষণে তা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। এগুলোর কারণে দ্বিগুন গুনাহ হয়। এক. নাজায়েয বিষয় প্রকাশ্য করার গুনাহ। দুই. মানুষকে কষ্ট দেয়ার গুনাহ।

দ্বীনের নামে নাজায়েয কাজ: যারা গান বাদ্য বাজায় তাদের তো দ্বীনের বুঝ নেই। গুনাহ কাকে বলে তারও খবর নেই। সওয়াব কী জিনিস তাও খবর নেই। কিন্তু তার চেয়েও দুঃখের কথা হলো যারা দ্বীনের জন্য মেহনত করেন, যাদেরকে দ্বীনের প্রতিনিধি মনে করা হয়, তারাও এ ব্যাপারে উদাসীন। দেখা যায় মাইকে বিকট শব্দে প্রয়োজনাতিরিক্ত আওয়াজে ওয়াজ মাহফিল চলছে, অথবা হামদ নাত ইসলামী সঙ্গিত চলছে যদ্বরুণ মাহফিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সারা এলাকার লোক ঘুমাতে পারছে না।

ভালো করে বুঝে রাখুন, এতেও দ্বিগুন গুনাহ হবে। এক. মানুষকে কষ্ট দেয়ার গুনাহ। দুই. দ্বীনের ব্যাপারে মানুষের মনে ভুল ধারণা সৃষ্টির গুনাহ। কারণ, সাধারণ মানুষ তাদের এই কর্মকান্ডে এই বিরূপ ধারণা নিবে যে, বোধ হয় দ্বীনের কাজে এভাবেই মানুষকে কষ্ট দেয়ার নিয়ম। যারা দ্বীনকে মহব্বত করেন তারাও সাধারণত মাহফিলের বিকট শব্দে বিরক্ত হলেও এই জন্য কোনো প্রতিবাদ করেন না যে, এখানে দ্বীনি মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে না জানি গুনাহ হয়ে যায় কিনা? দ্বীনের সঙ্গে বেআদবী হয়ে যায় কিনা? এই ভয়ে প্রতিবাদ না করে সহ্য করে যায়।

এক ওয়ায়েজের ঘটনা: হজরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) এর একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি যে ঘরে অবস্থান করতেন, সে ঘরের নিকটে এক ওয়ায়েজ এসে অত্যন্ত উঁচু গলায় বিকট শব্দে লোকদেরকে ওয়াজ নসীহত করতেন। সে যুগে যদিও লাউড স্পিকারের প্রচলন ছিল না, কিন্তু তার গলায় সাংঘাতিক জোর ছিল। গলার আওয়াজই মাশাআল্লাহ মাইকের চেয়ে কম ছিল না। তিনি দীর্ঘক্ষণ ওয়াজ করতেন। এতে হজরত আয়েশা (রা.) এর কষ্ট হতো। একাগ্রচিত্তে ইবাদত অথবা বিশ্রাম করতে পারতেন না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি খলীফা হজরত ওমর (রা.) এর নিকট অভিযোগ দায়ের করেন। হজরত ওমর (রা.) ওয়ায়েজকে ডেকে বুঝালেন। ভাই নিঃসন্দেহে দ্বীনের কথা প্রচার করা অতি উত্তম কাজ। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি চাই না। তুমি ওয়াজ করো ভালো কথা কিন্তু ভবিষ্যতে হজরত আয়েশা গৃহের সামনে নয়, অন্য কোথাও ওয়াজ করো। যেন হজরত আয়েশার কষ্ট না হয়। আর যদি সেখানেই ওয়াজ করতে চাও তাহলে এমন আওয়াজে কথা বলো যাতে শুধুমাত্র মজলিশে উপস্থিত লোকেরা শ্রবণ করতে পারে। আওয়াজ শুধু মজলিসের মাঝেই সীমিত থাকে। দূরে না পৌঁছে।

এরপর কিছুদিন সব ঠিকঠাক। ওয়াজকারী তার ওয়াজ বন্ধ রাখল। কিন্তু কিছু লোকের মধ্যে জযবার আধিক্য প্রবল হয়। ওয়াজ ছাড়া তারা শান্তি পায় না। উক্ত ওয়াজকারী কয়দিন পরই পুনরায় হজরত আয়েশার গৃহের সামনে এসে বিকট স্বরে ওয়াজ শুরু করে দিল। হজরত আয়েশা পুনরায় খলীফার নিকট অভিযোগ দায়ের করলেন। এবার হজরত ওমর (রা.) তাকে ডেকে কঠিন গলায় বললেন, আগেরবার তোমাকে ভালোভাবে বুঝিয়েছিলাম, তোমার টনক নড়েনি। আবারও আগের মতো শুরু করেছ! আর যেন তোমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না শুনি। এই শেষবারের মতো তোমাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমার হাতে যে লাঠিটি দেখছো তা দিয়ে পিটিয়ে তোমার পিঠের ছাল তুলে ফেলব। দূর হও চোখের সামনে থেকে। হজরত ওমর (রা.) কঠিনভাবে শাষিয়ে তাকে বিদায় করলেন।

উঁচু স্বরে কোরআন তেলাওয়াত: সকল ফুকাহায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, বিকট স্বরে যে কোনো কাজ করা, যা দ্বারা লোকদের স্বাভাবিক কর্মকান্ড ব্যাহত হয় (যেমন: কেউ ঘুমাতে চাইলে ঘুমাতের পারে না, অসুস্থ মানুষ বিশ্রাম নিতে চাইলেও সম্ভবপর হয়ে উঠে না) এ জাতীয় কাজ সম্পূর্ণ হারাম। আর যদি এ জাতীয় কাজ দ্বীনের নামে করা হয় তাহলে দ্বিগুণ হারাম। কেননা এ দ্বারা সাধারণ মানুষের মনে দ্বীনের ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।

ফুকাহায়ে কেরাম আরো লিখেছেন, যেখানে কেউ ঘুমাচ্ছে সেখানে উচ্চ স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করবে না। এমনিভাবে যেখানে লোকেরা এমন কোনো কাজে ব্যস্ত রয়েছে যে, সেখানে কোরআন পড়া হলে তারা সেদিকে লক্ষ্য করবে না বা কোরআনের আদব রক্ষা করবে না তাহলে সেখানেও উঁচু স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করবে না। এমনিভাবে যেখানে উঁচু স্বরে কোরআন তেলাওয়াত করলে মানুষের কাজের ব্যাঘাত ঘটে সেখানেও জোরে তেলাওয়াত করবে না। এরূপ অগণিত মাসআলা শরীয়ত আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে যে, দ্বীনের কাজও এমনভাবে করতে হবে যেন অপরের কষ্ট না হয়।

তাহাজ্জুদের সময় নবী (সা.) এর সতর্কতা: হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে নবী করিম (সা.) যখন তাহাজ্জুদের জন্য উঠতেন তখন পাশে স্ত্রী ঘুমন্ত থাকতেন। সে সময়ে তিনি (সা.) কীভাবে উঠতেন? হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন قام رويدا و فتح الباب رويدا অর্থাৎ তিনি (সা.) অতি সন্তর্পনে ধীরে ধীরে উঠতেন এবং অতি সাবধানে শব্দ না করে দরজা খুলতেন যেন পাশে শায়িত স্ত্রীর ঘুম না ভেঙে যায়। অথচ মহানবী (সা.) এর সকল স্ত্রীই তাঁর জন্য এতো নিবেদিত প্রাণ ছিলেন যে, যদি মহানবীর (সা.) কোনো কাজে তাঁদের ঘুম ভেঙেও যেত কেউ বিরক্ত হতেন না, বরং একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করতেন। তবুও নবী করিম (সা.) এতোটা সতর্ক থাকতেন যে, আমার কোনো কাজে যেন স্ত্রীর সামান্যতম কষ্টও না হয়। আমরা তো দ্বীনী শিক্ষা ও আহকাম সম্পর্কে গাফেল হয়ে নিজে যা বুঝি তাই করি আর দ্বীনী শিক্ষার ওপর দোষ চাপিয়ে দেই। এটা অত্যন্ত খারাপ। আল্লাহ আমাদের সকলকে বেঁচে থাকার তৌফীক দিন।

জিকিরও নিচুস্বরে করা উচিত: একবার রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে নিয়ে কোনো যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। রাতের সফর ছিল। সফরের একঘেয়েমি দূর করতে লোকেরা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কাজ করে থাকেন যেন সফরের সময়টা আনন্দে কেটে যায় বিরক্তি ও একঘেয়েমির কারণ হতে না হয়। সে অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম জোরে জোরে জিকির শুরু করলেন। যেহেতু জিকির তাদের নিকট আনন্দদায়ক কাজ ছিলো। তখন রাসূল (সা.) তাদেরকে বললেন إنكم لا تدعون أصم و لاغائبا অর্থাৎ, তোমরা বধির কোনো স্বত্তাকে ডাকছো না, আর যেহেতু তিনি সর্বত্র বিরাজমান তাই তাকে ডাকার জন্য চিৎকার করার প্রয়োজন নেই। আস্তে ডাকলেও তিনি শুনবেন। মহানবী (সা.) এর এই শিক্ষা সম্পূর্ণ কোরআন অনুযায়ী। কেননা কোরআনে ইরশাদ হয়েছে -أدعوا ربكم تضرعا و خفية অর্থাৎ, তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক কাকুতি মিনতি করে নীচু স্বরে। এ জন্য দোয়া জিকির এবং দরূদ শরিফ পাঠে উঁচুস্বরে চিৎকার করার প্রয়োজন নেই। কেননা আমাদের উদ্দেশ্য তো আল্লাহ তায়ালাকে শুনানো আর তাঁকে শুনানোর জন্য চিৎকার করার প্রায়োজন নেই। আস্তে বললেও তিনি শুনবেন।

বাকশক্তি অনেক বড় নিয়ামত: বাকশক্তি মহান আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নিয়ামত। এ নিয়ামতের মর্মও অন্যান্য নিয়ামতের ন্যায় তখন অনুধাবন হয় যখন এ নিয়ামত নষ্ট হয়ে যায়। যদি কারো বাকশক্তি রহিত হয়ে যায় তখন সে তা ফিরে পাওয়ার জন্য সারা দুনিয়ার ধন-সম্পদ খরচ করতেও কুন্ঠাবোধ করে না। যার কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় তার জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। মনে ভাব প্রকাশ করতে না পারার তীব্র কষ্ট তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা বিনামূল্যে এ অমূল্য নিয়ামত আমাদেরকে দিয়ে রেখেছেন। আমরা সুন্দরভাবে সাবলীল ভঙ্গিমায় মনের ভাব অপরের নিকট  সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে পারি। এ জন্য মহান আল্লাহর এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা উচিত। এবং সঠিকভাবে এ নিয়ামত ব্যবহার করা উচিত। ভুলস্থানে এর অপপ্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রয়োজনাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। শুধু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যবহার করা উচিত।

সারকথা: এগুলো দ্বীনের আহকাম, যা আমরা এই আয়াতগুলো থেকে জানতে পারলাম। আফসোস, আমরা দ্বীনকে নামাজ, রোজা ইত্যাদী কতিপয় ইবাদতে সীমিত করে ফেলেছি। এবং জীবনের অপরাপর শাখাগুলোতে মহান আল্লাহর যে নির্দেশাবলী রয়েছি সেগুলোকে দ্বীনের অংশ মনেই করি না। যদ্বরুণ আজ আমরা সামাজিক বিপর্যয়ে পতিত রয়েছি। মহান আল্লাহ আপন দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে স্বীয় দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। এবং তার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমিন।